১৯ মে ২০১০
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্সে প্রকাশ্যে নেকাবে পুরো মুখ ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ করে প্রণীত খসড়া আইন প্রত্যাখানের জন্য ফরাসি আইন-প্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আগামী বুধবার সরকার কর্তৃক গৃহীত খসড়া আইনটি পাস করার জন্য সংসদে উত্থাপন করা হবে।
ইসলামিক হিজাব পালন নিয়ে দীর্ঘ জনবিতর্কের পর ফরাসি সরকার এই প্রস্তাবটি আইন আকারে সংসদে পাস করার জন্য পাঠাচ্ছে, যা পাস হলে প্রকাশ্যে নিজের মুখমণ্ডল পুরোপুরি ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ হবে।
“মুখমন্ডল ঢাকা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে স্বীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের কারণে বোরখা বা নেকাব ব্যবহারকারী নারীদের মত প্রকাশ ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা লংঘিত হতে পারে“- বলেছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইউরোপের বৈষম্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন জন ডালহুসেন।
প্রস্তাবিত আইনে আইন ভঙ্গ করার অপরাধে ১৫০ পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানা এবং/অথবা সামাজিক পুনর্বাসন কর্মসূচি সম্পূর্ণকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।
একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি বিল কয়েক সপ্তাহ আগে বেলজিয়ামের সংসদের নিম্নকক্ষে বিপুল ভোটে পাস হওয়ার পরপরই ফ্রান্সে অনুরূপ পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে গেলো।
ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আইন উপদেষ্টা পরিষদ ‘কাউন্সিল অফ স্টেট’ ইতোমধ্যে এই ধরনের সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আইন প্রণয়নকে ফ্রেঞ্চ সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পালনে ফ্রান্সের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় উল্লেখ করে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন।
“এবিষয়ে কাউন্সিল অফ স্টেটের পরামর্শ উপেক্ষা করা মানবাধিকার আইন এবং মুসলিম নারীদের অধিকার বিশেষ করে যারা পূর্ণ নেকাব পরতে ইচ্ছুক তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ বলে বিবেচিত হতে পারে,“ বলেছেন জন ডালহুসেন।
ফরাসি সরকার জননিরাপত্তার প্রয়োজনে এবং পূর্ণ নেকাব পড়তে অনিচ্ছুক নারীদের রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা দরকার বলে যুক্তি দেখিয়েছেন।
“নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈধ উদ্বেগের বিষয়টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সুনির্দিষ্ট স্থানগুলোতে পূর্ণ নেকাব পরিধান নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সুরাহা করা যেতে পারে। তাছাড়া যখন বস্তুনিষ্ঠভাবে দরকার এমন পরিস্থিতিতে মুখমণ্ডল উম্মোচন করা যেতে পারে যেমন পরিচয় পরীক্ষা করার প্রয়োজনে। ফরাসি আইনে এই ধরনের সীমিত বিধিনিষেধের অনুমোদন এখনই রয়েছে,” বলেছেন জন ডালহুসেন।
মহিলারা যাতে বাড়িতে কিংবা সমাজে পূর্ণ নেকাব পরিধানের জন্য চাপ বা নিপীড়নের সম্মুখীন না হয় তা দেখার বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের রয়েছে।
এই দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রের উচিত গৎবাধা লিঙ্গ ধারণা ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যেখানে প্রযোজ্য ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো মোকাবেলায় ফৌজদারি কিংবা পারিবারিক আইন প্রয়োগ করা।
একটি সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে যারা স্বইচ্ছায় পূর্ণ নেকাব পরিধান করছেন তাদের অধিকার লংঘিত হবে, এবং যারা ইচ্ছার বিরুদ্ধে নেকাব পড়তেন তারাও শাস্তি ভোগ করবেন।
“যে নারীরা জোরজবরদস্তির কারণে পূর্ণ নেকাব পরিধান করতেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে এখন তারা নেকাব পড়ে জনসম্মুখে গেলে রাষ্ট্র কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্ত হবেন, ফলে তারা হয়তো নিজেদের ঘরেই বন্দী রাখবেন। এটি একটি অনুৎপাদনশীল পদক্ষেপ।” বলেছেন জন ডালহুসেন।
“কেউ কেউ নেকাব পরিধান আপত্তিজনক বলে মনে করতে পারেন কিংবা সামাজিক রীতিনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিপরীত বলে মনে করতে পারেন। তবে মানবাধিকার আইনের ব্যাখ্যা এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট। একজন ব্যক্তির উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তাকে অন্য একজনের মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ আরোপের যৌক্তিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না,” বলেছেন জন ডালহুসেন।
তিনি আরো বলেন, “ফ্রান্সে নেকাবে পুরো মুখ ঢাকা সংক্রান্ত বেশিরভাগ জনবির্তকে ফ্রান্স প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধগুলো রক্ষার প্রয়োজনীয়তার দিকটি তুলে ধরা হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে না যে স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধগুলো এই ধরনের একটি বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়া যাবে।”
http://bangla.amnesty.org/bn/news-and-updates/french-politicians-urged-reject-ban-full-face-veils